বিনোদন ডেস্কঃ
(লেখা বিষয়ক কমেন্ট করবেন দয়া করে।)
চলচ্চিত্রের শিল্পীদের গল্প মানে আমাদের কাছে এক রূপ কথার গল্পের মতো।
তাঁদের সুখ দুঃখ, পাওয়া না পাওয়া মান অভিমান।
আমি ভাগ্যবতী বলবো নিজেকে এই অমূল্য তারকাদের সাথে আমার উঠা বসার সুযোগ হয়েছে।
আজকের পার্ট ম্যালেশিয়া।
৯৬ /৯৭সালের দিকে।
কিছু কারনে ছবির নাম বা প্রযোজকের নাম উল্লেখ করা ঠিক হবে না।
প্রথম অপ্রস্তুত হলাম ম্যালেশিয়া এয়ারপোর্ট নেমে।
কাষ্টমস দেখলেন, এক বস্তা চাল, এক বস্তা পেয়াজ, এক বস্তা আলু।
আমাদের সুটিং টিমের।
প্রযোজক কে ডাকলেন।
উনারা অর্থাৎ কাস্টমস অফিসার জিজ্ঞেস করলেন এসব কেনো?
প্রযোজিকা বললেনঃ আমরা যে কয়দিন থাকবো এগুলো আমাদের রেসন।
সব শিল্পীদের মুখ কালো হয়ে গেলো, একজন আর একজনের মুখ এর দিকে তাকাতে থাকলেন।
পাঁচশ স্কয়ার ফিট একটা ফ্লাটে আমাদের নিয়ে উঠালেন, সাথে সেই চাল, আলু, পিয়াজের বস্তা।
আমরা বোধহয় টোটাল দশ জন।
আমদের একটা রুম দেওয়া হলো, বাকিদের জন্য ঐটুকু জায়গা যথেষ্ট না।
বাকিরা বলতে ওখানে ছিলেন মোজাম্মেল স্যার।( ভাই)
হুমায়ুন আহমেদ সাহেবের নাটকে কাজ করেছেন।
এক সময় বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো উনার খুক খুক কাশির জন্য।
আপনাদের নিশ্চিত মনে আছে।
তাছাড়া উনি আদমজী কলেজ এর শিক্ষক ছিলেন।
সাধারণত শিল্পীদের খাবার দাবার,থাকার ব্যাবস্থা প্রযোজক করেন।
রাতের খাবার কি হবে?
ঐ বস্তা থেকে খাবার চলবে।
আমি একা মহিলা, বাকিরা পুরুষ।
কি আর করা রান্না ঘরে ঢুকে সেই মোটা চালের ভাত আর আলু ভর্তা করে দিলাম, সবাই খুশি হয়ে পেট ভরে খেলো।
মোজাম্মেল ভাই খুশি হয়ে বার বার আমার প্রসংসা করলেন।
দোয়া দিলেন।
আমাদের সাথে ডন ও ছিলো।
পরের দিন সবাই সারাদিন স্যুটিং থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে।
রাতের খাবার একই অবস্থা।
আমি বের হয়ে ডাল তেল টুকি টাকি নিয়ে এসে সবার রান্না করি।
সবাই মজা করেই খেতো।
আমি মোটেও বিরক্ত ছিলাম না।
আমার কাছে পিকনিক মনে হতো।
মোজাম্মেল ভাই এর সাথে গল্প করে অনেক কিছু শিখতে পারছি।
তৃতীয় দিনে রাজীব সাহেব এর অগ্নিমুর্তী দেখলাম।
আমাকে বললেন ব্যাগ গোছাতে।
আমাকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন।
হোটেল এ উঠলাম।
থ্রি ষ্টার টাইপ হোটেল।
স্যার সহ বেচারাদের একা ফেলে আসতে মায়া হচ্ছিলো।
হাতে যেটূকু খুচরা টাকা কয়েন ছিলো, ফাইটার ছেলেদের হাতে দিলাম।
নায়িকা ছিলো ভারতের প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী।
হঠাৎ বৃষ্টি ছবির নায়িকা।
ও আর ওর মাকে অন্য বাসায় রাখা হয়েছিলো।
ওদের ও একই অবস্থা, খাবার এর সমস্যা।
প্রিয়াঙ্কা আর ওর মাকে নিয়ে রাতে বাইরে খাওয়াতাম।
দিনের বেলা স্যুটিং এ সবাই এক জায়গায় হই।
সবাই বিরক্ত।
সিলিন্ডারে গ্যাস নেই।
খাওয়ার কষ্ট, আবার প্রডিউসার বলছেনঃ ওরা হট কেটলি নষ্ট করে ফেলেছেঃ আলু সিদ্ধ করতে গিয়ে।
যাই হোক সবাই অসন্তোষ প্রকাশ করছে, স্যুটিং বন্ধ হয়নি।
জহুর বারু বিচে স্যুটিং এর অবসরে আমি আর মোজাম্মেল ভাই গল্প করতাম আর কাঁদতাম।
কারন স্যারের এগারো বছরের তাজা ছেলেটা মারা গেছে কিছুদিন আগে, আমার জয় বিজয় ও নেই।
কতো কথা ,কতো গল্প শেষ হতো না।
সেই মোজাম্মেল স্যার আমাদের মাঝে নেই।
আপনাকে অনেক মিস করি মোজাম্মেল ভাই।
প্রিয়াঙ্কা বিয়ে করেছে ভালো আছে।
মা বাঙ্গালী হওয়ার কারনে ও খুব মিশুক।
ওর সাথে ও অনেক গল্প হতো।
হুমায়ুন আহমেদ সাহেব এর একটা প্রোগ্রাম সম্ভবত হোটেল সোনার গাঁয়ে।
রাজীব সাহেব এর সিডিউল না থাকায় আমাকে যেতে হয়েছে।
আমি উনার কিছু বই পড়ে জেনেছি, উনার গল্পের বেশির ভাগ নায়িকা নীল শাড়ী পরেন।
আমিও নীল শাড়ী পরেছিলাম।
দেখা হওয়ার পর বল্লামঃ রাজীব সাহেব কেনো যেতে পারেন নি, উনার পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইলাম।
মুচকি হেসে বললেনঃ ভাবী এই কালারের শাড়ী আপনাকে বেশ মানিয়েছে।
আমিও সাথে সাথে বললামঃ আপনার গল্পের নায়িকা হওয়ার চেষ্টা হাহা।
ভালো মানুষ।
উনার ব্যক্তি জীবন বাদ দিলে, আর একজন হুমায়ুন আহমেদ আমরা পাবো কি না কে জানে।
আমাদের এটি এম শামসুজ্জামান ভাই।
আমার বাচ্চারা যখন মারা যায় সবার মতো এটি এম ভাই ভাবী ও পাশে ছিলেন।
প্রতিদিন যোগাযোগ করতেন।
সমস্যা ছিলো আমার বাচ্চা নেওয়া নিয়ে।
আবার বাচ্চা আসলে হয়তো জয়,বিজয়কে হারানোর বেদনা কিছুটা লাঘব হবে।
আমি ডাক্তার এর দরজায়, দরজায় ঘুরতে থাকি।
এটি এম ভাই জানতে পেরে, আমাকে হুকুম কললেনঃ বৌমা কালকেই তোমার ভাবীর সাথে নারিন্দার পীর সাহেবের কাছে যাবে।
কি করা আমি ভাবীর সাথে কয়েকবার গিয়েছি।
যদিও আমি এসব বিশ্বাস করি না।
তাবিজ ও বেঁধেছি।
এটি এম ভাই এর বাসায় দেখতাম নারিন্দার হুজুরের ঔষধে রেক ভরা।
ভাবী কিছূটা অসুস্থ ছিলেন
ঐ সময় জেনেছিলাম ভাবী কোন ডাক্তার দেখান না।
হুজুর এর ঔসুধ খান।
হয়তো বিশ্বাসে মিলায় বস্তু।
পরবর্তীতে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন কি না জানি না।
নারিন্দার হুজুর আমাদের বাসায় ও আসতেন।
কিছুদিন পরে কড়া হরতাল।
উত্তরায় সুটিং।
এটি এম ভাই আমাদের উত্তরার বাসায় থেকে স্যুটিং করবেন।
রুম গুছিয়ে সব ব্যবস্থা করে দিলাম।
আমি বলবো ওরকম একজন আল্লাহ্ ওয়ালা মানুষ আমি দেখিনি।
কোন কিছুর সমালোচনা করতে শুনলাম না।
সারারাত রুমে লাইট জ্বলতো।
আমার ও ঘুম নেই।
যতরাত হোক উঁকি দিয়ে দেখতাম হাতে তজবি দোয়া পড়ছেন।
কখন ঘুমাতেন, সারাদিন কি করে কাজ করেন, জিজ্ঞেস করলে বলতেনঃ আল্লাহ্ শক্তি দেন।
আলহামদুলিল্লাহ্ উনার মতো একজন সাদা মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি।
কথায় কথায় জানলাম, উনার কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নেই।
এতো ছবিতে কাজ করেন টাকা কই।
বললেনঃ এক লাখ টাকা জমলেই মহা খুশি, ওমরা করতে চলে যান।
রাজীব সাহেব যখন হলি ফ্যামিলিতে ভর্তি, বাঁচার আশা নেই।
সেদিন এটি এম ভাই আর রাজীব সাহেবের গলা জড়িয়ে কাঁন্না থামাতে পারছিলাম না।
আমি সহ ডাক্তার নার্স ও কেঁদেছিলেন।
আমি উনার দোয়া পেয়েছি।
একদিন আমরা সব নাই হয়ে যাবো।
এমন কাজ করি যেনো মানুষ বলে আহারে ভালো মানুষ ছিলেন।
“দেবী”
4/4 2025
লেখক: প্রযোজক দেবি গাফফারের ফেস বুক ওয়াল থেকে। চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রয়াত রাজিবের সাবেক স্ত্রী।
