
অনলাইন ডেস্কঃ
রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জন্য ‘কঠিনতম সংকট’ হিসেবে অভিহিত করে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সামনে কঠিনতম সংকট হলো—রোহিঙ্গা সমস্যার সম্ভাব্য কোনো সমাধান আমাদের হাতে নেই। যত দিন যাচ্ছে, সমস্যা তত দীর্ঘায়িত হচ্ছে।’
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন। দুই দিনের এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকস (দায়রা)। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু করা না গেলে এই সংকট আগামী দশকেও এই অঞ্চলের মানুষকে ভোগাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। এজন্য রোহিঙ্গাদের নিয়ে আগামী সাত-আট বছর সামনে রেখে একটি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকট এখন একটি জাতীয় সমস্যা থেকে আঞ্চলিক হুমকিতে রূপ নিচ্ছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মনে করিয়ে দেন, প্রায় ১০ লাখ তরুণ রোহিঙ্গা, যাদের অনেকেই এখন কৈশোর বা বিশের কোঠায়, তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য শিবিরে আটকে রাখা যাবে না। তিনি আবারও সতর্ক করে বলেন, ‘এটা ভাবা বোকামি যে তারা চিরকাল একটি আশাহীন জীবন মেনে নেবে। এই সংকটের সমাধান না হলে তা বাংলাদেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে এবং এটি একটি গুরুতর আঞ্চলিক ও সম্ভবত বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হবে।’
আগামীর বাংলাদেশে তরুণরাই রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও গুণগত পরিবর্তন আনবে— এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরতে চাই না। আমি আশা করি, তরুণরা এই বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন করে সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনীতি এখনো আমাদের প্রজন্মের নেতাদের হাতে, তবে আগামী ১০-১৫ বছরে তরুণরা অভিজ্ঞতা অর্জন করে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। দেশের একটি ছোট অংশই মানসম্মত শিক্ষা পায়, আর গ্রামীণ এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্দশাগ্রস্ত। উচ্চশিক্ষার উন্নয়নেও পদক্ষেপ নিতে হবে।’
কনফারেন্সে যোগ দিয়ে মালয়েশিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মাজলি বিন মালিক বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরে এসেছে। সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সংলাপ করছে, এটি খুবই ভালো পদক্ষেপ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এসব সংস্কারের সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের যে কোনো দেশের অগ্রগতির জন্যই একটি লিটমাস টেস্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।’
তিনি শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন এবং এই দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। এ ছাড়া তিনি আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ আসিয়ানকে পাশে পাবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ড. ডেভিড জ্যাকম্যান বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গায় যেভাবে টাকার ব্যবহার হয়, এতে করে চাঁদাবাজির হার বেড়ে যায়। এ ছাড়া ক্ষমতা দেখানোর সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ফ্যাসিবাদ সরকারের যে কাঠামো ছিল, তাতে পরিবর্তন আসেনি বলে উল্লেখ করেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান। তিনি বলেন, ‘এটা হতাশার বিষয়। এজন্য অনেক শিক্ষার্থী, অনেক নাগরিক হতাশ। তবে আমি আশাবাদী। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা বুঝতে পারছেন, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কারণ, মানুষ আর সেটা মেনে নেবে না। যদিও পুরোনো শাসন কাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়নি, তবে পুরোনো শাসন কাঠামোর পুনর্গঠন করে তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ, সেই কাঠামো কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—এসব নিশ্চিত করতে পারবে না। মানুষ এখন যা চায়, তার সঙ্গে তারা আপস করবে না। রাজনীতিকে আরও উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের উৎস নিয়ে ভাবতে হবে।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারদারাজান বলেন, ‘বাংলাদেশ তার ভবিষ্যতের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ভারত ও বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশ যা করতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দিকে ইঙ্গিত করে।’
নেপালের সাবেক মন্ত্রী ড. দীপক গাওয়ালি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণরা যারা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তাদের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।’
দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করেন সংসদে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, ‘গত ১৫ বছরে দেশে লেনদেনভিত্তিক একটি ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। যার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কবজা করে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিয়েছিলেন। এ ধরনের সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যই হয়তো তারা জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরই বাংলাদেশের বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্তির প্রধান দ্বার। দায়রা একটি ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তারা বঙ্গীয় বদ্বীপে জ্ঞানের উৎপাদন ও অগ্রগতি নিয়ে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গতিশীলতা বোঝাপড়ার চর্চায় নিবেদিত।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা বলেন, ‘পেশিশক্তিনির্ভর পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করেছে দেশের মানুষ। শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটেনি। বরং দীর্ঘদিন চলে আসা পুরো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বদলে দেওয়ার জন্যই ঘটেছে।’