
অনলাইন ডেস্কঃ
দেশের বাজারে সবজির দাম বেশকিছু দিন ধরেই বাড়তি। অন্যান্য নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সবজির বাজারও চড়া থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, সূত্রাপুর, শ্যামবাজারসহ একাধিক বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ভোক্তাই অল্প পরিমাণে সবজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারে এখন সবজির মধ্যে শুধু আলু ও পেঁপের দামই কিছুটা কম। এই দুটি বাদে বেশিরভাগ সবজির দামই ৮০ টাকার ওপরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাস থেকে গ্রীষ্মকালীন সবজির উৎপাদন ভালো থাকায় বাজারে এসবের দাম ছিল সহনীয়, কিন্তু জুনের শেষদিকে সরবরাহ ভালো থাকলেও বৃষ্টি শুরুর অজুহাতে সব ধরনের সবজির দাম বাড়াতে থাকেন ব্যবসায়ীরা। ভোক্তারা বলছেন, আগের মতো এখন বাজার তদারকি করা হচ্ছে না বলেই ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে সবকিছুর দাম বাড়াচ্ছেন।
বেশিরভাগ সবজির দামই ৮০ টাকার ওপরে: আজ সকালে কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি করলা মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, টমেটো ১৬০ থেকে ১৮০, ঢ্যাঁড়শ ৭০ থেকে ৮০, শসা ১০০, পটোল ৮০ টাকা, বরবটি ১০০, ঝিঙা ৮০, ধুন্দল ৮০, কাঁকরোল ৮০, বেগুন (গোল) ১৪০, বেগুন (লম্বা) ৮০ থেকে ১০০, চিচিঙ্গা ৮০ এবং কচুরমুখী প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৮০ টাকায়। অন্যদিকে ভারতীয় গাজর ১৪০ টাকা, ধনেপাতা ৪০০ এবং ক্যাপসিকাম ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবজির মধ্যে আলু ও পেঁপেই মিলছে একটু কম দামে। আলু প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা ও পেঁপে প্রতি কেজি ২০-৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুম বদল, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি আর পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়াই সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ। তারপর কিছু এলাকায় বন্যা চলছে, বৃষ্টিতে কৃষক ঠিকমতো ফসল তুলতে পারেন না। পানি শুকিয়ে গেলে বৃষ্টি কমে গেলে আবার দাম কমে যাবে।
নিউমার্কেটের সবজি বিক্রেতা হাসান আলী বলেন, বাজারে সব ধরনের সবজি সরবরাহ অনেক কম। বেশিরভাগ সবজির মৌসুম শেষ হওয়ার কারণে মূলত সরবরাহ কম হচ্ছে। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে, সেজন্য সবজি নষ্টও হচ্ছে। নতুনভাবে সবজি বাজারে উঠতে শুরু করলে দাম কমে আসবে। দাম বাড়ার পর থেকে সবজি বিক্রি অনেক কমে গেছে। মানুষ এখন কম পরিমাণে সবজি কিনছে। আগে এক কেজি সবজি কিনলে এখন আধা কেজি কিনছে।
হাতবদল হয়ে দাম বাড়ে পণ্যের: জায়গায় জায়গায় হাতবদল হয়ে ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সবজির দাম বেড়ে যায় উল্লেখ করে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, সবজি নিয়ে আসার পর ট্রাকে থাকা অবস্থাতেই বিক্রি হয়। আরেকজন কিনে নেন। এভাবে হাতবদলে দাম বাড়ে। কারওয়ান বাজারে রাতে পাইকারি যে দামে সবজি বিক্রি হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি দরে বিক্রি হয় খুচরা পর্যায়ে। হাত বদলায় আর দাম বাড়ে।
সূত্রাপুরের খুচরা বিক্রেতা জহির বলেন, গত কয়েকদিন ধরে কাঁচা তরকারির দাম বেড়েছে। এর কারণ যতটা বুঝতে পারলাম, অনেক জেলায় বন্যা ও বৃষ্টির কারণে এমনটি ঘটছে। তারপরও যারা বড় ব্যবসায়ী আছেন, তারা আবার সিন্ডিকেট করছেন। কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন পণ্য মজুত রেখে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। আমরা যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তারা মালপত্র কিনতে এসে ঝামেলায় পড়ি।
বাজারে তদারকি বাড়ানোর দাবি: বাজারে সব ধরনের সবজির দামের ঊর্ধ্বগতিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। নিত্যপণ্যের দামে এমন ঊর্ধ্বগতির জন্য মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন তারা। তাদের মতে, বাজারে সরকারের কঠোর মনিটরিং থাকলে ব্যবসায়ীরা এমন করতে সাহস পেতেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
শ্যামবাজারে বাজার করতে আসা নওশীন নামে একজন ক্রেতা বলেন, আমার একটা ছোট সংসার, তাও এখন বাজার করতে গেলে কান্না আসে। জিনিসপত্রের এত দাম বেড়েছে, তাহলে আমরা কী খেয়ে বাঁচব। কয়েকমাস আগেও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে ইচ্ছামতো বাজার কিনতে পারতাম, এখন ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকাতেও তা করতে কষ্ট হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সারা দেশে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে যে অভিযান পরিচালিত হতো, সেটা অনেকটাই কমে গেছে। আইনের শক্ত প্রয়োগ না থাকার কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর অসাধু ব্যবসায়ীদের মনে ভয় ছিল, কিন্তু এখন সেটা নেই, তারা আইনকে তোয়াক্কা করছে না, বরং তারা অসাধুভাবে ব্যবসা করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এতে বাজার লাগামহীন হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে একমাত্র পথ আইনের শক্ত প্রয়োগ। আইনের কঠোর প্রয়োগ হলেই নিত্যপণ্যের দাম কমে আসবে।