
অনলাইন ডেস্কঃ
দিন যতই যাচ্ছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন রকম জটিলতা ততই প্রকাশ্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনী সড়ক এখনো মসৃণ নয়। কারণ, নির্বাচনী পদ্ধতির বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচন কি গতানুগতিকভাবে সরাসরি ভোটে হবে, নাকি পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি চালু হবে, এটি এখনো অমীমাংসিত। যা এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সেইসঙ্গে জুলাই সনদ এখনো ঘোষণা হয়নি। দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি সংস্কার ইস্যুতে। দলগুলো যার যার অবস্থানে অনড়। বিশেষ করে আইনি ভিত্তি দিয়ে জুলাই সনদ ঘোষণার পর সেই আলোকে আগামী নির্বাচন চায় জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল। সব মিলিয়ে জনমনে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত সময় আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সংশয় ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দূর করা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এর জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা ও সব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ।
এমন প্রেক্ষাপটে নানা গুঞ্জন আর আলোচনার পর অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের একটি রোডম্যাপ (পথনকশা) ঘোষণা করেছে ইসি। যাতে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ও দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চূড়ান্ত করাসহ ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই রোডম্যাপ ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষ এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বলছে, তারা ইসির রোডম্যাপে খুশি। জামায়াতের ভাষ্য, এটা গতানুগতিক ও কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক। আর এনসিপি এই রোডম্যাপকে সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল বলে উল্লেখ করেছে। তবে অন্য বেশ কয়েকটি দলের নেতা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যে পথকনকশা দিয়েছে তা ইতিবাচক ও তাতে তারা আশাবাদী। অন্যদিকে রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রোডম্যাপ ঘোষণা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা। তবে এটি অনিষ্পন্ন মূল প্রশ্নগুলোর সমাধান করে না। নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যা একটি মৌলিক অনিশ্চয়তা। সবকিছু ছাপিয়ে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়াটা মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন এই রোডম্যাপ অনুমোদন করে। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গতকাল এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। এতে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ও দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চূড়ান্ত করা। দুই ডজন কাজের পরিকল্পনার মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের কথাও রয়েছে। সংলাপ, মতবিনিময়, মিটিং, ব্রিফিং, প্রশিক্ষণ, মুদ্রণ, বাজেট বরাদ্দ, আইটিভিত্তিক প্রস্তুতি, প্রচারণা, সমন্বয় সেল, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক থেকে যাবতীয় কর্মপরিকল্পনা মাথায় রেখে উল্লেখযোগ্য খাত ও বাস্তবায়নসূচি রোডম্যাপে স্থান পেয়েছে। ইসি আগেই জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে। আর তপশিল ঘোষণা করা হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে গত ৫ আগস্ট আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে রোজার আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ-সংক্রান্ত চিঠিও দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। সিইসি বলেছেন, ভোটের তারিখের প্রায় দুই মাস আগে তপশিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশন সভায় আলোচনা শেষে জানানো হয়, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তপশিল দেবে ইসি।
ইসির এই রোডম্যাপ ঘোষণায় সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রোডম্যাপ ঘোষণায় আমরা আশাবাদী হয়েছি যে, নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ।
আর ইসির রোডম্যাপকে ‘সুসংবাদ’ আখ্যা দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তবে ইসির এই রোডম্যাপকে গতানুগতিক ও বিভ্রান্তিমূলক আখ্যা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত ছিল।’
ইসির রোডম্যাপের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা আতাউর রহমান গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আধুনিক জাতি রাষ্ট্রে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। আমরাও নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছি। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ একটি রক্তস্নাত বিশেষ পরিস্থিতিতে বিরাজ করছে। দেশ থেকে স্বৈরতন্ত্র চিরস্থায়ী মুক্তির জন্য। সেই বিষয়ে কোনো রোডম্যাপ না দিয়ে পুরোনো বন্দোবস্তের নির্বাচনী রোডম্যাপ জুলাইকে অস্বীকার করার নামান্তর।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কারের জন্য নানা কার্যক্রম চললেও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সংস্কারের সব চেষ্টা এখন কাগুজে দলিলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, নির্বাচন কি বিদ্যমান নিয়মে হবে না পিআর পদ্ধতিতে হবে, তা নিয়ে কোনো সমাধান হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করা যায়নি। নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে রাজনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা জাতির, আশা, আকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে উপেক্ষা করে পুরোনো অশুভ রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা ছাড়া কিছু না।’
অবশ্য ইসির রোডম্যাপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, তারা আশা করেছিলেন নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার আগে ইসি রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় করবে। সরকার ও ইসি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যপারে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করলেও জনমনে নির্বাচন নিয়ে একটা সংশয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে; এর প্রধান কারণ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপারে আস্থাশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা কঠিন হতে পারে।
ইসির রোডম্যাপকে দায়সারা বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা। তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসি ২৪টি কাজকে প্রাধান্য দিয়ে একটি রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে মনে হয়, এটি গতানুগতিক বা দায়সারা গোছের। নির্বাচন আয়োজনের জন্য যেসব কাজ অতি দ্রুত করা সম্ভব বা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, সেখানে যে টাইম ফ্রেম বেঁধে দেওয়া হয়েছে তাতে আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দেহ বা নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে সিইসি আগেই বলেছেন, সংবিধানে যেভাবে আছে, ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এ ব্যাপারে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকছে না। আশা করি প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যেই তারা সব কাজ সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করবেন।’
এদিকে ইসির রোডম্যাপ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এনসিপি। তারা এটিকে সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পুরোনো পথে হাঁটতে চায়। পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছা কোনোদিন সম্ভব নয়। সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমাধান বা ঐকমত্যে না আসতে পারে, সেটি হবে দুর্ভাগ্যজনক। তার জন্য অতীতের মতো দলগুলোর সঙ্গে দেশ ও দেশের জনগণকেও তার মাশুল দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক সময় কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের ক্ষুদ্র ও হীন স্বার্থের কারণে দেশ ও জনগণের স্বার্থ দেখতে চায় না। এটি উচিত নয়। সেজন্য দলগুলোর মধ্যে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও দেশ ও জনগণের স্বার্থে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। এটা সবার জন্যই মঙ্গল ও কল্যাণকর হবে।’
ইসির রোডম্যাপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ‘রোডম্যাপ ঘোষণা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও এটি অনিষ্পন্ন মূল প্রশ্নগুলোর সমাধান করে না। নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যা একটি মৌলিক অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে বড় দ্বিধা নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে। কেননা, এবারের সংসদ নির্বাচন কি গতানুগতিকভাবে সরাসরি ভোটে হবে, নাকি পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে, তা এখনো অমীমাংসিত। এই অনির্দিষ্টতা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে একটি অনীহা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।’
সাধারণ মানুষের মনে যে সন্দেহ, সংশয় কাজ করছে, তা দূর করা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এককভাবে সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘সেজন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা ও সব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ। রোডম্যাপ একটি প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি, কিন্তু একটি সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য মৌলিক প্রশ্নগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি। নতুবা, ঘোষিত রোডম্যাপও শুধু একটি তাত্ত্বিক কাঠামোই থেকে যাবে, যা প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে না।’