
অনলাইন ডেস্কঃ
নিয়মিত কমে আসছে দেশের নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন। ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানি করা হলেও তা যথেষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিয়েছে। এরই মধ্যে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় একাধিক নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এলাকায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পেতে অনুসন্ধান কার্যক্রমের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্থলভাগে পার্বত্য এলাকায় দুটি এবং বঙ্গোপসাগরে ২৪টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তবে সাগরভিত্তিক দরপত্র আহ্বানের পর আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় সেই পরিকল্পনা থমকে গেছে। এখন আর নির্বাচনের আগে নতুন করে সাগর বা স্থলে কোনো দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা নেই। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি-পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, আমরা দরপত্রের খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিভাগের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখন আর নতুন করে সাগর বা স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করবে না। এসব কার্যক্রমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ জড়িত। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর আগেও সাগরভিত্তিক দরপত্রে কয়েকটি কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কেউ অংশ নেয়নি। সময় বাড়ানোর পরও কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই এখন এ দায়িত্ব পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের ১১ মার্চ বঙ্গোপসাগরের ২৪টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র জমার শেষ সময় ছিল ৯ সেপ্টেম্বর, পরে সময় বাড়িয়ে ৯ ডিসেম্বর করা হয়। কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি দরপত্র নথি কিনলেও কেউ জমা দেয়নি। এরপর যখন তাদের কাছে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়, তখন তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানায়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির কারণে তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। চলতি বছরের মার্চে ফের দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা হলে সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলেন, এ মুহূর্তে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন। গ্যাস-তেল কোম্পানিগুলো শুধু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, অনেক সময় এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারও যুক্ত থাকে। তাই বিনিয়োগ আনতে হলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যা কেবল পেট্রোবাংলার একার বিষয় নয়, এর সঙ্গে পুরো রাষ্ট্র জড়িত।
বঙ্গোপসাগরে আগ্রহ বাড়াতে এবার পিএসসিকে আগের তুলনায় আরও আকর্ষণীয় করা হয়েছে। আগে নির্দিষ্ট দামে গ্যাস কিনলেও এবার ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যদি ৮০ ডলার হয়, তবে গ্যাসের দাম হবে ৮ ডলার। আগের পিএসসিতে অগভীর সাগরের জন্য এই দাম ছিল ৫ দশমিক ৬ ডলার আর গভীর সাগরের জন্য ৭ দশমিক ২৫ ডলার। নতুন নিয়মে সরকারের শেয়ারও কিছুটা কমানো হয়েছে।
একই কারণে স্থলভাগেও এখন কোনো দরপত্র আহ্বান করছে না অন্তর্বর্তী সরকার। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটি ব্লক—২২(এ) এবং ২২(বি)-তে অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন বণ্টন চুক্তির খসড়া সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি গ্যাসের দাম ৯ থেকে ৯ দশমিক ৫ ডলার প্রস্তাব করলেও যৌথ সভায় তা কমিয়ে ৮ ডলারে নির্ধারণের পক্ষে মত দেন পেট্রোবাংলা ও বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে স্থলভাগে শেভরন ও তাল্লো নামে দুটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি গ্যাস উত্তোলন করছে। শেভরনের কাছ থেকে গ্যাস কেনা হয় ২ দশমিক ৭৬ ডলারে, আর তাল্লোর কাছ থেকে ২ দশমিক ৩১ ডলারে। রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস থেকে গ্যাস কেনা হয় মাত্র ২৫ সেন্টে, আর বাপেক্স থেকে প্রায় ১ ডলারে। অন্যদিকে কাতার ও ওমান থেকে আমদানি করা এলএনজির গড় মূল্য যথাক্রমে ১০ দশমিক ৬৬ ও ১০ দশমিক ০৯ ডলার।
পার্বত্য এলাকার ব্লক ২২(এ) ও ২২(বি) অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য হলেও সেখানে ভূতাত্ত্বিক তথ্য সীমিত এবং গ্যাস উত্তোলন, অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য ব্যয় অনেক বেশি। এজন্য দাম কিছুটা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্রের ১১৩টি কূপ থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত এলএনজি যুক্ত হয়ে প্রতিদিন ২ হাজার ৮৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।